বোধিলাভ / সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
জানুয়ারি মাসের শেষ। শীতের প্রকোপ কমে এসেছে, হাফহাতা সোয়েটারই যথেষ্ট, আমার আবার উলিকট ঠিক পছন্দ
না কেমন যেন গলার কাছে দেখা যায় যতই হোক শিক্ষক বলে কথা।নতুন শিক্ষাবর্ষ চাপ তেমন
নেই। অল্প পড়া আর নতুন ছেলেমেয়েদের একটু বুঝে নেওয়া। ভালই কাটছিল, কাল হয়ে দাঁড়াল সেন্সাসের নিমন্ত্রণ পত্রটা, সেদিন
হেডস্যার বিডিও আপিসের খামটা হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললেন কাজটা বেশ ঝামেলার আগের বারে
নাকি সামান্য ভুলের জন্য সারারাত জেগে বিডিও আপিসে কাজ করতে হয়েছিল, মনে মনে ভাবলাম আমি যে কত ঘাটের জল খেয়ে প্রাইমারী স্কুলে চাকরি করতে
এসেছি তা জানলে আমাকে শোনাতেন না। তবে চুপচাপ থাকাই বুদ্ধিমানের কাজ নাহলে আবার
মিড-ডে মিলের খাতা সারার ঝক্কিটা আমার ঘাড়ে না পড়ে।তবু পুরানো চাল ভাতে বাড়ে তাই
দেরি না করে পরেরদিনই টিফিনের পর সুপারভাইজারের কাছ থেকে যাবতীয় কাগজপত্র বুঝে
নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম গণনা ব্লকের খোঁজে, নাম আদুড়ি-২। আদিবাসী
এলাকা দুপুর আড়াইটের সময় একদম ফাঁকা রাস্তা, জিজ্ঞেস
করার জন্য কেউ নেই তবু আন্দাজ মতো কিছুদূর গেলাম। গরু ছাগল ছাড়া কাউকেও দেখা যাচ্ছে
না,
আরও খানিকটা এগুতে দেখলাম একজন আদিবাসী মহিলা শুকিয়ে যাওয়া দু-চারটে
তরকারির ঝুড়ি নিয়ে আমার রাস্তাতেই যাচ্ছে, জিজ্ঞেস করলাম দিদি
রাস্তাটা কি আদুড়ি যাচ্ছে? শুনে আমার দিকে এমন করে তাকাল
বুঝলাম ভাষাটা বোধগম্য হয়নি। পড়ানোর সুবিধের জন্য কয়েকটা আদিবাসী ভাষা শিখে
নিয়েছিলাম ছাত্রদের কাছ থেকে, তাও আবার আমার নাকি উচ্চারণ ঠিক
হয়না, শুনেছি আদিবাসীরা তাদের
মহিলাদের সম্ভ্রম নিয়ে বাড়তি আবেগ রাখে, তাই পণ্ডিত রঘুনাথ
মুরমু কে স্মরণ করে বললাম 'ও দিদি ওকাতে চালাকানা' (ওদিকে কোথায় যাচ্ছেন)? চাপা স্বরে বলল ‘আদুড়ি’। স্বস্তির নিশ্বাস ফেললাম।
গ্রামটা ভালই, পশ্চিম দিকে শুশুনিয়া
পাহাড়ের প্রথম চুড়াটা যেন দূর থেকে হাতির মতো শুঁড় তুলে আশীর্বাদ করছে, ছড়িয়ে ছিটিয়ে কিছু মাটির ঘর, আর কত রকমের যে
গাছ। অনেকদিন পর যেন একটু ভালো অক্সিজেন পেলাম, আমাদের মতো
সিগারেট চোষা জীবের অক্সিজেন বড়ো দরকার, জোরে জোরে কতকবার নিশ্বাস
নিয়ে পুরানো বাতিকটা ঝালিয়ে নিলাম, কিন্তু পিছন দিকে তাকালে
যতদূর দৃষ্টি যায় কিছুই তো চোখে পড়ছে না আর লোকজন কোথায়! আর একটু বরন
এগিয়ে দেখা যাক। একটা লোক এদিকেই আসছে মনে হচ্ছে, এই যে শুনছেন?
যা বাবা দেখেও দেখল না সামনে একটা মন্দির দেখা যাচ্ছে ওখানেই বরং যাই। লোকজন
থাকতে পারে। মানুষের সাথে কথা বলতে মিশতে আমার ভালই লাগে বাবার ট্রান্সফারের চাকরির
জন্য কত জায়গা যে ঘুরেছি আর বন্ধুও বানিয়েছি অনেক তবে একজন ছাড়া সেরকম কারো সাথে
যোগাযোগ নেই বললেই চলে। তমলুক হ্যামিলটনে পড়ার সময় শুভেন্দু বলে এক বন্ধু হয়েছিল সে
এখনও যোগাযোগ রেখেছে। ও আবার চিঠিতে একটা করে ছবি পাঠাত চেহারা কেমন চেঞ্জ হয়েছে
জানাবার জন্য। সামনে একটা কিন্তু মন্দিরের মতন দেখা যাচ্ছে, ঠাকুর
ঠুকুর তো কিছু দেখতে পাচ্ছি না। নাহ্ মনসা ঠাকুর বা
সন্ন্যাসী নয়, তাহলে সিন্দূর লাগানো মাটির সাপমূর্তি থাকত
। কতকগুলো বাচ্চা ছেলে আমাকে দেখতে পেয়েই দে ছুট, এই শোন শোন
আরে কি মুশকিল আমি কি ভূত নাকি। ‘কিছু বলছেন’ পাশের সরু গলি থেকে কেউ ডাকছে মনে হচ্ছে, হ্যাঁ
এদিকে একটু আসুন না, দেখলাম গলায় ময়লাটে একটা গামছা নিয়ে একজন
এগিয়ে এলো। ‘বলুন’, আপনার নাম? ‘তারাপদ মান্ডি’। আমি বললাম তা দাদা এটাই আদুড়ি তো?
‘হ্যাঁ’, তামাটে রং এর বছর তিরিশের যুবক,
যাক বাংলাটা তাহলে বোঝে দেখছি দু এক জন বুঝলেই কাজ চালিয়ে নেব। এটা
কিসের মন্দির? ‘মারাং বুরু আদিবাসী দেবতার, কি ব্যাপার বলুন তো আপনি কি পঞ্চায়েত থেকে আসছেন’?
গণনা করতে এসেছি।‘এই তো সেদিন এসেছিল একটা
এটা আবার কিসের’? এই গ্রামটা কত বড়ো? ‘ছড়িয়ে
ছিটিয়ে অনেকটাই হবে’ আর লোকসংখ্যা? ‘তা
প্রায় সাতশ’। একটা ডাটা সীট বার করে কলাম সংখ্যাটা গুনে
দেখলাম লোক পিছু বাইশ! এখানে কি সবাই আদিবাসী উপজাতি? ‘না তা
কেন হবে তবে বেশীর ভাগই’। আমার একজন কমবয়সী বাংলা জানা ছেলে
চাই যে আমাকে সাহায্য করবে কিছু টাকা পয়সা আমি দিয়ে দেব। ‘এখনি
দরকার’? হ্যাঁ পেলে তো ভালই হয়। মনে মনে ভাবলাম পেলে আজই
ব্লু -প্রিন্ট একটা করে নেব অন্তত নকসা দেখে গ্রামটা আগে বুঝতে হবে নাহলে কাজটা
শুরুই করা যাবে না। গ্রামটা এরকম ফাঁকা ফাঁকা কেন? ‘এখন সবাই
কাজে বেরিয়েছে আপনি বিকেল চারটের পর সবাইকে পেয়ে যাবেন না হলে আপনাকে সকালে আসতে
হবে কাজে যাবার আগে’। মনে মনে বেশ রাগ হল যেন আমার কোন কাজ
নেই, আর গোটা গ্রামই একসাথে কাজে বেরিয়েছে অদ্ভুত ব্যাপার,
এটা ডাকাতের গ্রাম নাতো!কিন্তু ভারি মুশকিল হল সকালে এলে তো এখান
থেকেই স্কুলে যেতে হবে খাবারও জুটবে না আর যদি বিকালে আসি তো ফিরবো কখন একেই তো
একঘণ্টা মোটর বাইক করে আসতে হয়।
আচ্ছা এক গ্লাস জল দিতে পারেন ‘হ্যাঁ আনাচ্ছি শুকুরমনি হিযুপ্পে......’(এদিকে জল নিয়ে আয়)। অনেক অনেক নাম শুনেছি শুকুরমনি নামটা এই প্রথম তবে যে জল নিয়ে এলো তার নামের সাথে চেহারার কোন মিল নেই ফুটফুটে বছর সাতেক এর একটি মেয়ে। কিসে পড়িস জিজ্ঞেস করতেই চলে গেল। ‘বাংলা বোঝে না’। ও আচ্ছা। তা আপনি কাজ করেন না? ‘চাষ করি’। জলটা তো দেখছি ঝামা ইটের মতো লাল এটা খাবো কি করে! এখানে কুয়ো নেই? ‘কুয়ো সেতো অনেক খরচের কে করাবে’।এই জল খেয়েই মনে হচ্ছে লোকটার গায়ের রং তামাটে হয়ে গেছে আবার যদি আর্সেনিকের গল্প থাকে তাহলে তো আর রক্ষে নেই।বরং মুখে চোখে জল নেয়াই ভালো। উত্তর দিকে মাঠগুলো দূর থেকে বেশ সবুজ দেখাচ্ছে এখনতো বোরো ধানের সময়, ধান বেশ ভালই হয়েছে দেখছি। ‘আমার হাতেই হয়েছে’। আপনার জমি? ‘না শুশুনিয়ার মালিক। ‘এটা কিসের গণনা’? জনগণনা । ‘আপনি তাহলে ব্লকের স্টাফ’? আপাতত আমি ভারত সরকারের।
আচ্ছা এক গ্লাস জল দিতে পারেন ‘হ্যাঁ আনাচ্ছি শুকুরমনি হিযুপ্পে......’(এদিকে জল নিয়ে আয়)। অনেক অনেক নাম শুনেছি শুকুরমনি নামটা এই প্রথম তবে যে জল নিয়ে এলো তার নামের সাথে চেহারার কোন মিল নেই ফুটফুটে বছর সাতেক এর একটি মেয়ে। কিসে পড়িস জিজ্ঞেস করতেই চলে গেল। ‘বাংলা বোঝে না’। ও আচ্ছা। তা আপনি কাজ করেন না? ‘চাষ করি’। জলটা তো দেখছি ঝামা ইটের মতো লাল এটা খাবো কি করে! এখানে কুয়ো নেই? ‘কুয়ো সেতো অনেক খরচের কে করাবে’।এই জল খেয়েই মনে হচ্ছে লোকটার গায়ের রং তামাটে হয়ে গেছে আবার যদি আর্সেনিকের গল্প থাকে তাহলে তো আর রক্ষে নেই।বরং মুখে চোখে জল নেয়াই ভালো। উত্তর দিকে মাঠগুলো দূর থেকে বেশ সবুজ দেখাচ্ছে এখনতো বোরো ধানের সময়, ধান বেশ ভালই হয়েছে দেখছি। ‘আমার হাতেই হয়েছে’। আপনার জমি? ‘না শুশুনিয়ার মালিক। ‘এটা কিসের গণনা’? জনগণনা । ‘আপনি তাহলে ব্লকের স্টাফ’? আপাতত আমি ভারত সরকারের।
পরেরদিন যথারীতি স্কুল চুলোয় দিয়ে পৌঁছে গেলাম, দেখি তারাপদ বাবু আগে থেকেই আমার অ্যাসিস্ট্যান্ট খুঁজেই রেখেছিলো গ্রামের
একমাত্র শিক্ষিত বিমান ক্লাস এইট পাশ। তুমি মোটামুটি গ্রামের সব ঘর গুলো চেনো তো?
‘হ্যাঁ’।টাকার জন্য চিন্তা করো না, ‘সে আপনি বুঝে শুনে একটা দিয়ে দেবেন’।ঠিক আছে,
নকসা বার করে দেখলাম পশ্চিম দিকে কিছু বিক্ষিপ্ত ঘর আছে, চলো আর এই নাও মোমরং,
তোমার এক এ চন্দ্রগুলো মনে আছে তো? ‘তা আছে (মুচকি হেসে)’ ব্যাস আমি যেখানে যত বলব সেই
ঘরের দেওয়ালে তত লিখবে কেমন? ‘ঠিক আছে’।ব্যাগ
থেকে বিডিও অফিসের কার্ডটা বার করে গলায় ঝুলিয়ে নিলাম অবশ্যি কার্ডটার মূল্য কতটা
পাব ভগবান জানে, এই ঘোর ফাঁকা গ্রামে বিনা পারমিশনে লোকের
বাড়িতে ঢোকা!
কিছুদূর সোজা অনেকটা হেঁটে প্রথম বাড়িটা পেলাম, বিমান ১ নং দাও আমি দরজায় কড়া নাড়লাম, দরজা বললে ভুল হবে একটা মোটা টিনের পাত তার দিয়ে দেওয়ালে আটকানো আর শেকলটা একটা পেরেকে আটকেছে, নিচটা প্রায় আধহাত ফাঁকা। কোনও সাড়া এলো না, আর একবার ডাকি ভেবে যেই কড়ায় হাত দেব অমনি নিচের ফাঁকা যায়গাটা দিয়ে প্রায় খান পাঁচেক হাঁস বেরিয়ে গেল আমি এক লাফে দু পা পিছনে, এবার ভিতর থেকে আওয়াজ এলো ,উত্তর দিলো বিমান , ওদের ভাষায়। কিছুক্ষণ পর একটা লোক বেরিয়ে এলো। ‘কি ব্যাপার? ’আমি জনগণনা করতে এসেছি। ‘করে কি করবেন?’ এগুলো সরকার জানতে চায় আপনার বাড়িতে কয়জন লোক কে কি করে, কটি ঘর, গোয়াল ঘর ইত্যাদি। যা ট্রেনিং যে বলেছিল গড়গড় করে মুখস্থ বললাম কারণ অনেকেই যে এরকম বলতে পারে সেটা ট্রেনিং এ বলেছিল। জিজ্ঞেস করলাম আপনি কি করেন? ‘কি আর করব কিছুই না’ উত্তরটা জানা ছিল তাই বিলম্ব না করে শেখানো দ্বিতীয় প্রশ্নটা করলাম। কিছু তো করেন না হলে সংসার চলছে কি করে? ‘ওই কেউ কাজে ডাকলে কাজ করি’ যেমন? ‘লেবার খাটা’ বছরে ৬ মাস কাজ করেন ? ‘কাজ কই, লিখুন না যাতে কিছু কাজ পাই’। কাগজে আংশিক সময়ের শ্রমিকে টিক দিয়ে বললাম হ্যাঁ সেই জন্যই তো সব জানছি। আপনার বাড়িতে ছেলে মেয়ে কটি? ‘তিনটি মেয়ে একটি ছেলে’। স্কুলে যায়? ছেলেটা যায় মেয়েদের পাঠাইনি’ কেন বলবেন? ওরা গিয়ে কি করবে, বিয়ে হয়ে যাবে কদিনে আর পাতা কুড়োবে কে’ পাতা? হ্যাঁ ওটা আর হাঁস বেচেই তো সংসার চলে। গ্রামে এখনো কম বয়সে বিয়ে যে প্রচলিত তা বুঝতে আর বাকি রইল না, তবে আর যাই হোক ছেলেটাকে যে কাজে না পাঠিয়ে স্কুলে দিয়েছে শুনে আনন্দিত হলাম।
কিছু নোট করে নিয়ে হাঁটা দিলাম পাশের ঘরটার দিকে ইতিমধ্যে বেশ কয়েকজন কাচ্চাবাচ্চা আমার পিছু নিয়েছে, সাথে কয়েকজন কিশোরও, আমিও খানিকটা বুকটান করে চলতে লাগলাম, যেন সিবিআই ইনভেস্টিগেশন করতে বেরিয়েছি বিশাল বাহিনী নিয়ে। বেশ বড়ো একটা কুলগাছ পাশের ঘরের উঠানে, এটাতে কুল আছে? ‘অনেক’ পেছন থেকে একজন বলল,নিচে কয়েকটা কুল পড়েছিল,এবছর তো কুল খাওয়ায় হয় নি,অগ্নিমূল্য তার উপর কে আনে অত দূর বাজার থেকে, কুড়োতে যাব একজন বলল দাঁড়ান পেড়ে দিচ্ছি বলে প্রায় বানরের মতো লাফ দিয়ে গাছে উঠে গেল ,আরে বাপরে আস্তে দেখো আবার পড়ে টড়ে যেওনা, উপর থেকে আওয়াজ দিয়ে বলল আপনি কাজ করুন আমি পেড়ে রাখছি ততক্ষণে গাছের মালিক এসে হাজির, সেরেছে এরপর বোধ হয় আর সম্মান থাকলো না, ‘আসুন কি বলতে হবে’ বুঝলাম গোটা গ্রামে আমার খবর ছড়িয়ে গেছে এটা আপনার বাড়ি? ‘হ্যাঁ’,কত জন থাকেন? ‘তিন ভাই মিলে তেরো জন, ঘরটার দিকে তাকিয়ে দেখলাম দুটো মাটির রুম, সুড়ঙ্গের মতো ছোট দুটো দরজা। উঠানে বসে বছর ছয়েকের একটা বাচ্চা পান্তা ভাত খাচ্ছে গায়ের ছেঁড়া গেঞ্জিটা শেষ কবে কাচা হয়েছে বলা মুশকিল। এটা আপনার ছেলে? ‘না দাদার ছেলে’, কি করেন আপনার দাদা? আমরা সবাই বিড়ি বাঁধি। বিক্রি কি শুশুনিয়াতে করেন? না না এই গ্রামেই যা হয়, ওখানে কোম্পানির বিড়ি ছাড়া নেয় না। কুলোতে শুকনো বিড়ির দিকে নজর যেতেই আমাকে বলল খাবেন একটা, বিড়ি যে খাইনি তা না ফাস্ট ইয়ার এ পড়ার সময় বিড়িটাই বেশী খেতাম পরে লোকলজ্জা এড়াতে সিগারেটে আসক্তি বাড়াই, কই দেখি, মুখে নিতেই একটা দিয়াশলাই বার করল ভদ্রলোক, আমি বললাম লাইটার আছে, একটান দিয়ে বুঝলাম পাতাটা বেশ কড়া,তবে প্রকাশ না করে বললাম ভালো,বাচ্চাটা স্কুলে যায়নি কেন? ‘যায় তবে আজ শনিবার স্কুলে ভাত হয়না তাই পাঠাইনি, আর পাঠিয়েইবা কি হবে ঘরে এসে তো আবার খাবার দিতে হয়’।
আমি যখন প্রথম স্কুলে ঢুকেছিলাম তখন ছেলেমেয়েদের খাবার দেওয়া দেখে ভেবেছিলাম প্রায় দিনই পেপারে মিড-ডে মিল দুর্নীতির লেখা উঠে, নির্ঘাত আমাদেরটার নাম ও উঠবে কিছুদিনের মধ্যে, একদিন হেডস্যারকে সাহস করে বলালাম এদের আর একটু ভালো খাওয়ানো যায় না, আমাকে আফিসরুমে ডেকে নিয়ে গিয়ে বলেছিলেন ‘মিড-ডে মিলের জন্য বরাদ্দ মোট ছাত্র সংখ্যার পঁচাশি শতাংশ চাল, আর তিন টাকা ছিয়াশি পয়সার তরকারি ও জ্বালানী বলুন এর থেকে আর কি ভালো খাওয়াবো’, সত্যিই তো তিন টাকা ছিয়াশি পয়সায় কি আর পেট ভরে! ততক্ষণে কুল এনে হাজির, আমি যেন এদের কুটুম হয়ে গেছি, তোমরা কিছু নাও, ‘না না আমরা তো খাই আপনি নেন’, মনে মনে ভাবলাম হায় ভগবান এরা মানুষকে এতো ভালোবাসে, তুমি এদের একটু ভালবাসতে পার না!
ব্যাগের মধ্যে কয়েকটা ক্লোরোমিন্ট ছিল মুখশুদ্ধির জন্য বার করে ওদের দিয়ে বললাম এই নাও তোমরা আমাকে কুল খাওয়ালে তার জন্য তোমাদের চকলেট।বিমান কে জিজ্ঞেস করলাম পরের বাড়িটায় কতজন আছে, বলল একজন বিধবা তার মেয়ে আর নাতি নিয়ে থাকে, স্বামী মারা গেছে আর মেয়েটার বর ছেড়ে অন্য বিয়ে করেছে তাই বাপের বাড়িতেই থাকে।ঘরটায় ঢুকে দেখলাম বছর সত্তরের বৃদ্ধা দড়ির খাটে শুয়ে, ইনিতো অসুস্থ মনে হচ্ছে ‘হ্যাঁ কাল একজন কোয়াক ডাক্তার দেখে গেছেন ওষুধও দিয়েছেন কিন্তু কিনতে পারি নি’, কই দেখি কি দিয়েছে ওষুধ? কাগজ নিয়ে দেখলাম কিছু ভিটামিন।
কিছুদূর সোজা অনেকটা হেঁটে প্রথম বাড়িটা পেলাম, বিমান ১ নং দাও আমি দরজায় কড়া নাড়লাম, দরজা বললে ভুল হবে একটা মোটা টিনের পাত তার দিয়ে দেওয়ালে আটকানো আর শেকলটা একটা পেরেকে আটকেছে, নিচটা প্রায় আধহাত ফাঁকা। কোনও সাড়া এলো না, আর একবার ডাকি ভেবে যেই কড়ায় হাত দেব অমনি নিচের ফাঁকা যায়গাটা দিয়ে প্রায় খান পাঁচেক হাঁস বেরিয়ে গেল আমি এক লাফে দু পা পিছনে, এবার ভিতর থেকে আওয়াজ এলো ,উত্তর দিলো বিমান , ওদের ভাষায়। কিছুক্ষণ পর একটা লোক বেরিয়ে এলো। ‘কি ব্যাপার? ’আমি জনগণনা করতে এসেছি। ‘করে কি করবেন?’ এগুলো সরকার জানতে চায় আপনার বাড়িতে কয়জন লোক কে কি করে, কটি ঘর, গোয়াল ঘর ইত্যাদি। যা ট্রেনিং যে বলেছিল গড়গড় করে মুখস্থ বললাম কারণ অনেকেই যে এরকম বলতে পারে সেটা ট্রেনিং এ বলেছিল। জিজ্ঞেস করলাম আপনি কি করেন? ‘কি আর করব কিছুই না’ উত্তরটা জানা ছিল তাই বিলম্ব না করে শেখানো দ্বিতীয় প্রশ্নটা করলাম। কিছু তো করেন না হলে সংসার চলছে কি করে? ‘ওই কেউ কাজে ডাকলে কাজ করি’ যেমন? ‘লেবার খাটা’ বছরে ৬ মাস কাজ করেন ? ‘কাজ কই, লিখুন না যাতে কিছু কাজ পাই’। কাগজে আংশিক সময়ের শ্রমিকে টিক দিয়ে বললাম হ্যাঁ সেই জন্যই তো সব জানছি। আপনার বাড়িতে ছেলে মেয়ে কটি? ‘তিনটি মেয়ে একটি ছেলে’। স্কুলে যায়? ছেলেটা যায় মেয়েদের পাঠাইনি’ কেন বলবেন? ওরা গিয়ে কি করবে, বিয়ে হয়ে যাবে কদিনে আর পাতা কুড়োবে কে’ পাতা? হ্যাঁ ওটা আর হাঁস বেচেই তো সংসার চলে। গ্রামে এখনো কম বয়সে বিয়ে যে প্রচলিত তা বুঝতে আর বাকি রইল না, তবে আর যাই হোক ছেলেটাকে যে কাজে না পাঠিয়ে স্কুলে দিয়েছে শুনে আনন্দিত হলাম।
কিছু নোট করে নিয়ে হাঁটা দিলাম পাশের ঘরটার দিকে ইতিমধ্যে বেশ কয়েকজন কাচ্চাবাচ্চা আমার পিছু নিয়েছে, সাথে কয়েকজন কিশোরও, আমিও খানিকটা বুকটান করে চলতে লাগলাম, যেন সিবিআই ইনভেস্টিগেশন করতে বেরিয়েছি বিশাল বাহিনী নিয়ে। বেশ বড়ো একটা কুলগাছ পাশের ঘরের উঠানে, এটাতে কুল আছে? ‘অনেক’ পেছন থেকে একজন বলল,নিচে কয়েকটা কুল পড়েছিল,এবছর তো কুল খাওয়ায় হয় নি,অগ্নিমূল্য তার উপর কে আনে অত দূর বাজার থেকে, কুড়োতে যাব একজন বলল দাঁড়ান পেড়ে দিচ্ছি বলে প্রায় বানরের মতো লাফ দিয়ে গাছে উঠে গেল ,আরে বাপরে আস্তে দেখো আবার পড়ে টড়ে যেওনা, উপর থেকে আওয়াজ দিয়ে বলল আপনি কাজ করুন আমি পেড়ে রাখছি ততক্ষণে গাছের মালিক এসে হাজির, সেরেছে এরপর বোধ হয় আর সম্মান থাকলো না, ‘আসুন কি বলতে হবে’ বুঝলাম গোটা গ্রামে আমার খবর ছড়িয়ে গেছে এটা আপনার বাড়ি? ‘হ্যাঁ’,কত জন থাকেন? ‘তিন ভাই মিলে তেরো জন, ঘরটার দিকে তাকিয়ে দেখলাম দুটো মাটির রুম, সুড়ঙ্গের মতো ছোট দুটো দরজা। উঠানে বসে বছর ছয়েকের একটা বাচ্চা পান্তা ভাত খাচ্ছে গায়ের ছেঁড়া গেঞ্জিটা শেষ কবে কাচা হয়েছে বলা মুশকিল। এটা আপনার ছেলে? ‘না দাদার ছেলে’, কি করেন আপনার দাদা? আমরা সবাই বিড়ি বাঁধি। বিক্রি কি শুশুনিয়াতে করেন? না না এই গ্রামেই যা হয়, ওখানে কোম্পানির বিড়ি ছাড়া নেয় না। কুলোতে শুকনো বিড়ির দিকে নজর যেতেই আমাকে বলল খাবেন একটা, বিড়ি যে খাইনি তা না ফাস্ট ইয়ার এ পড়ার সময় বিড়িটাই বেশী খেতাম পরে লোকলজ্জা এড়াতে সিগারেটে আসক্তি বাড়াই, কই দেখি, মুখে নিতেই একটা দিয়াশলাই বার করল ভদ্রলোক, আমি বললাম লাইটার আছে, একটান দিয়ে বুঝলাম পাতাটা বেশ কড়া,তবে প্রকাশ না করে বললাম ভালো,বাচ্চাটা স্কুলে যায়নি কেন? ‘যায় তবে আজ শনিবার স্কুলে ভাত হয়না তাই পাঠাইনি, আর পাঠিয়েইবা কি হবে ঘরে এসে তো আবার খাবার দিতে হয়’।
আমি যখন প্রথম স্কুলে ঢুকেছিলাম তখন ছেলেমেয়েদের খাবার দেওয়া দেখে ভেবেছিলাম প্রায় দিনই পেপারে মিড-ডে মিল দুর্নীতির লেখা উঠে, নির্ঘাত আমাদেরটার নাম ও উঠবে কিছুদিনের মধ্যে, একদিন হেডস্যারকে সাহস করে বলালাম এদের আর একটু ভালো খাওয়ানো যায় না, আমাকে আফিসরুমে ডেকে নিয়ে গিয়ে বলেছিলেন ‘মিড-ডে মিলের জন্য বরাদ্দ মোট ছাত্র সংখ্যার পঁচাশি শতাংশ চাল, আর তিন টাকা ছিয়াশি পয়সার তরকারি ও জ্বালানী বলুন এর থেকে আর কি ভালো খাওয়াবো’, সত্যিই তো তিন টাকা ছিয়াশি পয়সায় কি আর পেট ভরে! ততক্ষণে কুল এনে হাজির, আমি যেন এদের কুটুম হয়ে গেছি, তোমরা কিছু নাও, ‘না না আমরা তো খাই আপনি নেন’, মনে মনে ভাবলাম হায় ভগবান এরা মানুষকে এতো ভালোবাসে, তুমি এদের একটু ভালবাসতে পার না!
ব্যাগের মধ্যে কয়েকটা ক্লোরোমিন্ট ছিল মুখশুদ্ধির জন্য বার করে ওদের দিয়ে বললাম এই নাও তোমরা আমাকে কুল খাওয়ালে তার জন্য তোমাদের চকলেট।বিমান কে জিজ্ঞেস করলাম পরের বাড়িটায় কতজন আছে, বলল একজন বিধবা তার মেয়ে আর নাতি নিয়ে থাকে, স্বামী মারা গেছে আর মেয়েটার বর ছেড়ে অন্য বিয়ে করেছে তাই বাপের বাড়িতেই থাকে।ঘরটায় ঢুকে দেখলাম বছর সত্তরের বৃদ্ধা দড়ির খাটে শুয়ে, ইনিতো অসুস্থ মনে হচ্ছে ‘হ্যাঁ কাল একজন কোয়াক ডাক্তার দেখে গেছেন ওষুধও দিয়েছেন কিন্তু কিনতে পারি নি’, কই দেখি কি দিয়েছে ওষুধ? কাগজ নিয়ে দেখলাম কিছু ভিটামিন।
সন্ধ্যা নেমে এসেছে, দূরে কোথাও
মাদল বাজছে, দিনশেষে আকাশের আবির রং এরাও দেখে প্রতিদিন, প্রতিনিয়ত, সবাইকার সাথে একই কিন্তু আলাদা, কাউকে
বলার নেই শোনারই বা কে আছে, আধপেট কিন্তু লোভী না, স্বপ্ন দেখে অলিক না, কেন্দুয়া পাতার বাস্তব, জীবন-যুদ্ধে রেশ নেই, স্বার্থ নেই শুধু বেঁচে থাকার
রশদ চাই,সকাল থেকে সন্ধে। গতর খাটানোর জায়গা আমরা দিতে
পারিনি।
ফোনের রিংটা বেজে উঠল, হেডস্যারের। ‘কখন ফিরছেন’? এই বেরবো এবার। সব ডেটা নিচ্ছেন নাকি? কটা ঘর হল?আমি বললাম তিনটে। ‘যতটা দরকার ততটা নেন বাকিটা বাড়িতে দেখেশুনে একটা বসিয়ে নেবেন অনেকগুলো ঘরতো ওখানে’। আমি ফোন রেখে বিমানকে দশ টাকা দিয়ে বললাম এটা রাখ কাল আবার আসব।
রাস্তায় আসতে আসতে ভাবছিলাম আমি অধম তবু আমার মনে হয় খালি পেটে খালি গায়ে অ আ ঢোকে না আর আধপেটে আধ জামায় অম্বল করে। গাছের শিকড়ে পোকা ধরলে জল দিলে গাছ বড়ো হয় না, ফলও দেয় না, আগে ক্ষয় ধরা শিকড়ে সার দরকার।
ফোনের রিংটা বেজে উঠল, হেডস্যারের। ‘কখন ফিরছেন’? এই বেরবো এবার। সব ডেটা নিচ্ছেন নাকি? কটা ঘর হল?আমি বললাম তিনটে। ‘যতটা দরকার ততটা নেন বাকিটা বাড়িতে দেখেশুনে একটা বসিয়ে নেবেন অনেকগুলো ঘরতো ওখানে’। আমি ফোন রেখে বিমানকে দশ টাকা দিয়ে বললাম এটা রাখ কাল আবার আসব।
রাস্তায় আসতে আসতে ভাবছিলাম আমি অধম তবু আমার মনে হয় খালি পেটে খালি গায়ে অ আ ঢোকে না আর আধপেটে আধ জামায় অম্বল করে। গাছের শিকড়ে পোকা ধরলে জল দিলে গাছ বড়ো হয় না, ফলও দেয় না, আগে ক্ষয় ধরা শিকড়ে সার দরকার।
কোন মন্তব্য নেই